ঢাকা    রোববার, ২৪ মে ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

‘গুপ্ত’ নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি


প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

‘গুপ্ত’ নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি
প্রতিকী ছবি : সংগৃহীত প্রতিকী ছবি : সংগৃহীত

মোকাররম মামুন

‘গুপ্ত’ দুই অক্ষরের পক্ষান্তরের তিন অক্ষরের ছোট এবং সহজ একটি শব্দ। এই ছোট একটি শব্দ, ছোট একটি জায়গায় ব্যবহার করে আজ তা একটি দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারনী স্থান জাতীয় সংসদে গিয়ে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, গুপ্ত শব্দটি নিয়ে বর্তমানে উত্তাল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। হচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য, চলছে মারামারি-ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়ার মতো ঘটনা।

‘গুপ্ত’র না জানা কথা

‘গুপ্ত’ শব্দটি আনুমানিক চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দি অর্থাৎ ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতের প্রাচীন গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল। সে সময় সেই সাম্রাজ্যটা ছিল এক “স্বর্ণযুগ”। এই “গুপ্ত” নামটার সাথে এক ধরনের ঐতিহ্য, মর্যাদা আর গৌরব জড়িয়ে আছে। ভারত ও বাংলাদেশের অনেক হিন্দু পরিবারের পদবির সাথেও “গুপ্ত”শব্দটি ব্যবহার হতে দেখা যায়। 

‘গুপ্ত’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত একটি বাংলা ভাষা। সংস্কৃত শব্দ গুপ্তা থেকে বাংলা ‘গুপ্ত’ শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। বাহ্যিকভাবে শব্দটিকে লুকিয়ে থাকা বা লুকানো হিসেবে দেখা গেলেও এর আরও বেশ কয়েকটি প্রয়োগ রয়েছে। যেমন, আড়াল বা প্রকাশ না করা, অগোচরে, অপ্রকাশিত ভাবে ইত্যাদি। দৈনন্দিন বিভিন্ন ঘটনা বা কাজে আমরা এই গুপ্ত শব্দটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে থাকি। কেউ রূপক অর্থে কেউবা আবার কোন কিছু গোপন করতে ব্যবহার করি। 

আরও বিস্তৃত করে বলতে গেলে, ‘গুপ্তধন’। অর্থ হলো কোন ধনসম্পদকে সকলের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে লুকিয়ে রাখাকে বুঝায়। 

আবার যদি বলি ‘গুপ্তচর’। এর অর্থ লুকিয়ে থেকে তথ্য সংগ্রহকারী। যদি কোন ব্যক্তি অন্য কারো কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপনভাবে সংগ্রহ করে তাহলে তাকে ‘গুপ্তচর’ বলা হয়। 

‘গুপ্ত স্বভাব’ আবার অনেকে নিজের পরিচয় কোন কোন জায়গায় প্রকাশ বা প্রচার করতে চায়না। তখন তাকে গুপ্ত স্বভাবের লোক বলে আখ্যায়ি করা হয়। অর্থাৎ, ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি রূপক অর্থে বিভিন্ন জন বিভিন্ন স্থানে নানা ভাবে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে থাকেন বা ব্যবহার করে থাকেন।

‘গুপ্ত’ হঠাৎ প্রকাশ্যে কেন

গুপ্তর উৎপত্তি বা শব্দটিকে কোন ক্ষেত্রে, কিভাবে, কখন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি ছোট এই শব্দটি হঠাৎ কখন আর কেন বড় হয়ে উঠলো, কিভাবেই বা স্থান করে নিলো সবার মুখে মুখে। কেনই বা এতোকিছু কিছু রেখে ছোট শব্দ ‘গুপ্ত’কে নিয়ে দেশজুড়ে চলছে রাজনৈতিক নেতাদের নানা কর্মকাণ্ড ?

‘গুপ্ত’ শব্দটি আমরা ঐতিহাসিকভাবে পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীণ সরকার দেশ ত্যাগের পর থেকে আলোচনার মাধ্যমে সকলের কাছে শব্দটি নতুন করে পরিচিতি লাভ করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং টকশোগুলোতে প্রচার বা সম্প্রচারের সময় দেশের তৎকালীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বিশিষ্টজনদেরকে এই গুপ্ত শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। 

পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক রাজনৈতিক দল অপর রাজনৈতিক দলকে হেয় করতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন জন দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের একটানা শাসনামলে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে বিভিন্ন পদে বা তাদের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সাথে থেকে আওয়ামী লীগার হয়ে রাজনীতি করার কথা বলেছে, ঠিক তেমনি ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপিও ঠিক একইভাবে জামায়াতকে সেই ভাবে সাব্যস্ত করতে দেখা গেছে। 

চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ভবনের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। ২০ এপ্রিল সোমবার রাতে কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন সেখানে গিয়ে গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্ররাজনীতি’ থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে এর পরিবর্তে ওপরে লিখে দেন ‘গুপ্ত’। বিষয়টি নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে সকালে দুই গ্রুপের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এর জেরে একই দিন বিকেলে আবারও সংঘর্ষে জড়ায় দুটি দল। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কলেজের ক্লাস ও নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ এবং মাস্টার্সের পরীক্ষা চালু থাকে। 

‘গুপ্ত’ ইস্যুতে উত্তপ্ত ছাত্র রাজনীতি

শুধু চট্টগ্রামেই নয়। ‘গুপ্ত’ ছড়িয়েছে চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী এবং জেলা শহরেও। রাজধানীর শাহবাগে ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদের মতো জায়গায় এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য প্রয়োগ করতেও দেখা গেছে। 

রাজধানীর শাহবাগে গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেলের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র সংগঠিত সংঘর্ষে ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের পোস্ট করা ছবিটি কুরুচিপূর্ণ। 

বিশ^ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলছি, যা বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাস পর্যন্ত গড়ায়। পরে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ সন্ধ্যায় শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে প্রতিবাদে সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ঘটে। হামলার মুখে থানার ভেতরে আশ্রয় নেন ডাকসু নেতা মুসাদ্দিক, জুবায়ের ও ঝুমা। যদিও ছাত্রদল সভাপতি নিজে থেকে তাদের তিনজনকে গন্ডোগোল থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

এদিকে, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। জানা গেছে, ‘গুপ্ত শিবির’ বলাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেলে নাফিস আব্দুল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন করে কয়েকজন শিক্ষার্থী। সে ঘটনার বিচারের জন্য সন্ধ্যায় অধ্যক্ষের কক্ষে যায় ছাত্রশিবির। অধ্যক্ষ বিচারের জন্য ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করে। কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচার দাবি করে ছাত্রশিবির। এ সময় হঠাৎ করে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। যদিও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে বলা হয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

অপরদিকে, গুপ্ত লেখাকে কেন্দ্র করে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে বৃহস্পতিবার দুপুরে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ হলে পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এখানেও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নাকচ করে বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে গুপ্ত লেখা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা যখন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও শহরের বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত গড়াচ্ছে ঠিক তখন শাহবাগের ঘটনাস্থল থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সভাপতি নিজে ছাত্রশিবির কর্মীদের উদ্ধারের পর ক্ষমা চাওয়া এবং ছাত্র শিবিরকে গুপ্ত রাজনীতি থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানানো কারো কারো কাছে নতুন প্রশ্নের জন্ম,আবার অনেকের মতে, ছাত্রশিবির নেতাদের পাশে গিয়ে দাড়ানো ছাত্রদল সভাপতি বা বিএনপির উদার রাজনীতির উদাহরনের চিত্র। তবে, যার মনে যে প্রশ্নেরই উদয় হোক না কেন, একটি ছোট গুপ্ত শব্দই ছাত্র রাজনীতিকে যে অস্থির করে তুলছে তা কিন্তু স্পষ্ট। 


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


‘গুপ্ত’ নিয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি

প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মোকাররম মামুন

‘গুপ্ত’ দুই অক্ষরের পক্ষান্তরের তিন অক্ষরের ছোট এবং সহজ একটি শব্দ। এই ছোট একটি শব্দ, ছোট একটি জায়গায় ব্যবহার করে আজ তা একটি দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারনী স্থান জাতীয় সংসদে গিয়ে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, গুপ্ত শব্দটি নিয়ে বর্তমানে উত্তাল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। হচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য, চলছে মারামারি-ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়ার মতো ঘটনা।

‘গুপ্ত’র না জানা কথা

‘গুপ্ত’ শব্দটি আনুমানিক চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দি অর্থাৎ ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতের প্রাচীন গুপ্ত সাম্রাজ্য ছিল। সে সময় সেই সাম্রাজ্যটা ছিল এক “স্বর্ণযুগ”। এই “গুপ্ত” নামটার সাথে এক ধরনের ঐতিহ্য, মর্যাদা আর গৌরব জড়িয়ে আছে। ভারত ও বাংলাদেশের অনেক হিন্দু পরিবারের পদবির সাথেও “গুপ্ত”শব্দটি ব্যবহার হতে দেখা যায়। 

‘গুপ্ত’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত একটি বাংলা ভাষা। সংস্কৃত শব্দ গুপ্তা থেকে বাংলা ‘গুপ্ত’ শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। বাহ্যিকভাবে শব্দটিকে লুকিয়ে থাকা বা লুকানো হিসেবে দেখা গেলেও এর আরও বেশ কয়েকটি প্রয়োগ রয়েছে। যেমন, আড়াল বা প্রকাশ না করা, অগোচরে, অপ্রকাশিত ভাবে ইত্যাদি। দৈনন্দিন বিভিন্ন ঘটনা বা কাজে আমরা এই গুপ্ত শব্দটিকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে থাকি। কেউ রূপক অর্থে কেউবা আবার কোন কিছু গোপন করতে ব্যবহার করি। 

আরও বিস্তৃত করে বলতে গেলে, ‘গুপ্তধন’। অর্থ হলো কোন ধনসম্পদকে সকলের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে লুকিয়ে রাখাকে বুঝায়। 

আবার যদি বলি ‘গুপ্তচর’। এর অর্থ লুকিয়ে থেকে তথ্য সংগ্রহকারী। যদি কোন ব্যক্তি অন্য কারো কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপনভাবে সংগ্রহ করে তাহলে তাকে ‘গুপ্তচর’ বলা হয়। 

‘গুপ্ত স্বভাব’ আবার অনেকে নিজের পরিচয় কোন কোন জায়গায় প্রকাশ বা প্রচার করতে চায়না। তখন তাকে গুপ্ত স্বভাবের লোক বলে আখ্যায়ি করা হয়। অর্থাৎ, ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি রূপক অর্থে বিভিন্ন জন বিভিন্ন স্থানে নানা ভাবে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে থাকেন বা ব্যবহার করে থাকেন।

‘গুপ্ত’ হঠাৎ প্রকাশ্যে কেন

গুপ্তর উৎপত্তি বা শব্দটিকে কোন ক্ষেত্রে, কিভাবে, কখন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি ছোট এই শব্দটি হঠাৎ কখন আর কেন বড় হয়ে উঠলো, কিভাবেই বা স্থান করে নিলো সবার মুখে মুখে। কেনই বা এতোকিছু কিছু রেখে ছোট শব্দ ‘গুপ্ত’কে নিয়ে দেশজুড়ে চলছে রাজনৈতিক নেতাদের নানা কর্মকাণ্ড ?

‘গুপ্ত’ শব্দটি আমরা ঐতিহাসিকভাবে পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীণ সরকার দেশ ত্যাগের পর থেকে আলোচনার মাধ্যমে সকলের কাছে শব্দটি নতুন করে পরিচিতি লাভ করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং টকশোগুলোতে প্রচার বা সম্প্রচারের সময় দেশের তৎকালীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন বিশিষ্টজনদেরকে এই গুপ্ত শব্দটি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। 

পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক রাজনৈতিক দল অপর রাজনৈতিক দলকে হেয় করতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি সামনে নিয়ে আসে। ২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন জন দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের একটানা শাসনামলে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে বিভিন্ন পদে বা তাদের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের সাথে থেকে আওয়ামী লীগার হয়ে রাজনীতি করার কথা বলেছে, ঠিক তেমনি ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপিও ঠিক একইভাবে জামায়াতকে সেই ভাবে সাব্যস্ত করতে দেখা গেছে। 

চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ভবনের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। ২০ এপ্রিল সোমবার রাতে কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন সেখানে গিয়ে গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্ররাজনীতি’ থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে এর পরিবর্তে ওপরে লিখে দেন ‘গুপ্ত’। বিষয়টি নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে সকালে দুই গ্রুপের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এর জেরে একই দিন বিকেলে আবারও সংঘর্ষে জড়ায় দুটি দল। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কলেজের ক্লাস ও নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষ এবং মাস্টার্সের পরীক্ষা চালু থাকে। 

‘গুপ্ত’ ইস্যুতে উত্তপ্ত ছাত্র রাজনীতি

শুধু চট্টগ্রামেই নয়। ‘গুপ্ত’ ছড়িয়েছে চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী এবং জেলা শহরেও। রাজধানীর শাহবাগে ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদের মতো জায়গায় এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য প্রয়োগ করতেও দেখা গেছে। 

রাজধানীর শাহবাগে গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেলের সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি পোস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র সংগঠিত সংঘর্ষে ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের পোস্ট করা ছবিটি কুরুচিপূর্ণ। 

বিশ^ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলছি, যা বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাস পর্যন্ত গড়ায়। পরে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ সন্ধ্যায় শাহবাগ থানায় জিডি করতে গেলে প্রতিবাদে সন্ধ্যায় শাহবাগে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ঘটে। হামলার মুখে থানার ভেতরে আশ্রয় নেন ডাকসু নেতা মুসাদ্দিক, জুবায়ের ও ঝুমা। যদিও ছাত্রদল সভাপতি নিজে থেকে তাদের তিনজনকে গন্ডোগোল থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

এদিকে, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। জানা গেছে, ‘গুপ্ত শিবির’ বলাকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেলে নাফিস আব্দুল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন করে কয়েকজন শিক্ষার্থী। সে ঘটনার বিচারের জন্য সন্ধ্যায় অধ্যক্ষের কক্ষে যায় ছাত্রশিবির। অধ্যক্ষ বিচারের জন্য ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করে। কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচার দাবি করে ছাত্রশিবির। এ সময় হঠাৎ করে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। যদিও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে বলা হয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

অপরদিকে, গুপ্ত লেখাকে কেন্দ্র করে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে বৃহস্পতিবার দুপুরে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ হলে পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এখানেও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নাকচ করে বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে গুপ্ত লেখা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা যখন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও শহরের বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত গড়াচ্ছে ঠিক তখন শাহবাগের ঘটনাস্থল থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সভাপতি নিজে ছাত্রশিবির কর্মীদের উদ্ধারের পর ক্ষমা চাওয়া এবং ছাত্র শিবিরকে গুপ্ত রাজনীতি থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানানো কারো কারো কাছে নতুন প্রশ্নের জন্ম,আবার অনেকের মতে, ছাত্রশিবির নেতাদের পাশে গিয়ে দাড়ানো ছাত্রদল সভাপতি বা বিএনপির উদার রাজনীতির উদাহরনের চিত্র। তবে, যার মনে যে প্রশ্নেরই উদয় হোক না কেন, একটি ছোট গুপ্ত শব্দই ছাত্র রাজনীতিকে যে অস্থির করে তুলছে তা কিন্তু স্পষ্ট। 



দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত