প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি কি হচ্ছে ? া
আরিফুল ইসলাম ||
ইরান যুদ্ধ বিশ্লেষণ- ৩৮ নং পর্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ এবং জটিল। এই সম্পর্কের ভেতরে রয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামরিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা। পরমাণু কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার কিংবা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ—এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এসব দৃশ্যমান ইস্যুর চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, যা কোনো ধরনের স্থায়ী সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।ইরান ঐতিহাসিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সন্দিহান। বিশেষ করে Donald Trump-এর নীতির কারণে এই অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে। Barack Obama-এর সময় প্রায় দুই বছরব্যাপী আলোচনার পর ইরান এবং বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে যে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল—Iran Nuclear Deal (JCPOA)—তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার পরমাণু কার্যক্রম সীমিত রাখতে সম্মত হয় এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সুযোগ পায়।কিন্তু ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। তিনি কখনোই পরিষ্কারভাবে বলেননি যে ইরান চুক্তির শর্ত ভেঙেছে; বরং তার অভিযোগ ছিল, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যথেষ্ট রক্ষা করতে পারছে না। এই একতরফা সিদ্ধান্ত ইরানের কাছে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে আসে এবং তারা এটিকে কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখে। এর ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় ইরান অনেক বেশি সতর্ক ও অনিশ্চিত অবস্থান নেয়।পরবর্তীতে Joe Biden প্রশাসন আবারও এই চুক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। তারা ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসে একটি নতুন সমঝোতার চেষ্টা করে। তবে ইরান তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে ভবিষ্যতে আবার কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই চুক্তি বাতিল করবেন না? যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে আলোচনার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় এবং অবিশ্বাসের দেয়াল আরও উঁচু হয়ে ওঠে।গত সোমবার Islamic Republic News Agency (ইরনা) এক প্রতিবেদনে জানায়, তার আগের দিন রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী Shehbaz Sharif-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian। সেই আলাপে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন আবারও আগের মতো নীতি অনুসরণ করছে এবং কূটনৈতিক উদ্যোগকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ঝুঁকি তৈরি করছে।এমন পরিস্থিতিতে তেহরান আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার অনেক বেশি সতর্কভাবে এগোতে চাইছে। তারা কোনো সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো না করে ধাপে ধাপে আলোচনায় অগ্রসর হওয়ার কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে দর–কষাকষির শক্তি অটুট রাখার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই কারণে ইরান যতটা সম্ভব নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী, যাতে আলোচনার টেবিলে তাদের প্রভাব বজায় থাকে।তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ইরানকে শেষ পর্যন্ত এই ইউরেনিয়াম মজুত পুরোপুরি বা বড় অংশে ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কারণ, আস্থার ঘাটতি দূর করে একটি স্থিতিশীল সমঝোতা গড়ে তুলতে হলে উভয় পক্ষকেই বাস্তবসম্মত ছাড় দিতে হবে।এই অবিশ্বাস যে একতরফা নয়, বরং দুই দিক থেকেই গভীর—তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর অবস্থান নিয়েছে। তেহরান বারবার দাবি করেছে, তাদের পরমাণু প্রকল্প সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ওয়াশিংটন মনে করে, এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। অতীতে সামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত কিছু গবেষণার ইঙ্গিত এবং গোপন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পুরোটা পালন করেনি।এই প্রসঙ্গে George W. Bush প্রশাসনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা Michael Doran মন্তব্য করেছেন যে, ইরান বহু বছর ধরে তাদের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করেছে। তার মতে, দেশটি বিভিন্ন স্থাপনা আড়ালে রেখেছে, কার্যক্রম গোপন করেছে এবং International Atomic Energy Agency-কে সম্পূর্ণ বা সঠিক তথ্য দেয়নি। ফলে ইরানের দেওয়া আশ্বাসের ওপর আস্থা রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।এই দ্বিধা–সন্দেহের বিষয়টি নতুন নয়। Ronald Reagan-এর সময় থেকেই একটি বিখ্যাত নীতি আলোচনায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে—“বিশ্বাস করো, তবে যাচাই করে নাও।” মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনার সময় এই ধারণাটি গুরুত্ব পায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আদৌ এই নীতির ভিত্তিতে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না।এদিকে Carnegie Endowment for International Peace-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক Karim Sadjadpour মনে করেন, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট বরাবরই ছিল, তবে এখন তা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান আশঙ্কা করে যে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সময় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে—even আলোচনার মাঝেও। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বাস করতে প্রস্তুত নয় যে ইরান সত্যিই পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে, এমনকি যদি তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে ছাড় সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই কূটনৈতিক অগ্রগতিকে সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করছে এবং একটি স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলছে।সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, উত্তেজনা ও অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। বরং আরেকবার আলোচনার সুযোগ রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে একটি কার্যকর চুক্তি গড়ে তুলতে হলে সেটিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই একতরফাভাবে সুবিধা নিয়ে পরে সরে দাঁড়াতে না পারে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।Barack Obama ও Joe Biden প্রশাসনের সময় ইরানের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা Robert Malley বলেন, চুক্তির কাঠামো তৈরিই সবচেয়ে কঠিন অংশ। কারণ, দুই পক্ষের কাছ থেকে যে ধরনের ছাড় চাওয়া হয়, তার প্রকৃতি এক নয়। ইরানের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমানো বা হস্তান্তরের মতো পদক্ষেপগুলো বাস্তব এবং দীর্ঘমেয়াদি, যা একবার বাস্তবায়ন করলে সহজে আগের অবস্থায় ফেরানো যায় না।অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত ছাড়—যেমন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ দেওয়া—মূলত নীতিনির্ভর, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবারও বদলে যেতে পারে। এই বৈষম্যের কারণেই ইরান চুক্তি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল নিতে চায়, যাতে প্রতিটি ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি যাচাই করা সম্ভব হয়।তবে Donald Trump-এর রাজনৈতিক ধরন বিবেচনায় এই ধীরগতির প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তিনি সাধারণত দ্রুত ফল দেখতে আগ্রহী, যা দীর্ঘ ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া কূটনৈতিক আলোচনার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর পাশাপাশি Iran Nuclear Deal (JCPOA) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো ইরানের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে, যা নতুন আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কোনো বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন। Carnegie Endowment for International Peace-এর গবেষক Karim Sadjadpour-এর মতে, আস্থার ঘাটতি ও সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর কারণে এমন সমঝোতায় পৌঁছাতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে—কখনো মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও লেগে যেতে পারে।সব মিলিয়ে বলা যায়, কূটনৈতিক দরজা এখনো খোলা থাকলেও সামনে পথটি কঠিন ও অনিশ্চিত। একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে হলে শুধু শর্ত নির্ধারণ নয়, বরং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত