ঢাকা    শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

চট্টগ্রাম বন্দরে

নিলামের কনটেইনার উধাও, দায় কার?


প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

নিলামের কনটেইনার উধাও, দায় কার?

দৃষ্টি অনলাইন: আইন লঙ্ঘনের দায়ে খালাস না হওয়া পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলো রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। কাস্টমস আইন-১৯৬৯-এর ৮২ ধারা অনুযায়ী, এসব পণ্য নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে, নিলামে বিক্রি হওয়ার পর যদি পণ্যভর্তি কনটেইনার রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়, তাহলে পুরো নিলাম প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে নিলাম হওয়া একটি কনটেইনারকে কেন্দ্র করে এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ই-অকশনের মাধ্যমে ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ওই কনটেইনারটিতে ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি (৪৭৮ রোল) ইনডিগো রঙের ফেব্রিক্স ছিল। বিডার পে-অর্ডার ও এ-চালানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে পণ্য বুঝে নিতে গিয়ে বাধে বিপত্তি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পণ্যভর্তি ওই কনটেইনারটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রিত পণ্যের মূল্যসহ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। কিন্তু দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিঠি চালাচালি চললেও কনটেইনারটির সন্ধান মেলেনি।

চট্টগ্রাম বন্দরে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিলাম হওয়া পণ্য আমদানিকারক বা বিডার বুঝে পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ১ কোটি ৬ লাখ টাকা মূল্যের ফেব্রিক্স ভর্তি একটি কনটেইনার ই-অকশনে বিক্রি হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করতে পারেনি। বিডার পে-অর্ডারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ জানায় কনটেইনারটির কোনো হদিস মিলছে না। এমন ঘটনা বন্দরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি আরও দুটি কনটেইনার উধাও হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিলামে অংশ নেওয়া বিডার শুল্কসহ সবধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত পণ্য বুঝে পাননি ক্রেতা। সুরক্ষিত এই বন্দরে পণ্য উধাওয়ের এমন ঘটনা এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিবেদন পেলে নির্ধারণ করা হবে গাফিলতি কার ছিল। এরপর দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নথিপত্রে যা আছে

কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাওয়া নথিপত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য চালান ডেলিভারি প্রদান করতে না পারায় নিলামে বিক্রিত পণ্যের বিপরীতে বিডার পরিশোধিত অর্থ ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধের জন্য অনুরোধ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, বিল অব লেটারের মাধ্যমে আমদানিকৃত ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি ফেব্রিক্স (৪৭৮ রোল) কালার-ইনডিগো জাতীয় পণ্য ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ই-অকশনে ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। যার মধ্যে বিড মূল্য ছিল ৮৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, অগ্রিম আয়কর ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং ভ্যাট ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ টাকা অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে বিডার অনুকূলে ডিও ইস্যু করা হয়। বিডার মোট ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা পে-অর্ডার ও এ-চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। পণ্য গ্রহণকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উক্ত কনটেইনার বিডারের অনুকূলে ডেলিভারি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের আরও দুটি কাপড়ভর্তি কনটেইনার রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে কেনা পণ্যের জন্য ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেও শেষ পর্যন্ত বন্দর ইয়ার্ডে গিয়ে কনটেইনারের সন্ধান পায়নি। সুরক্ষিত এই রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ভেতর থেকে পণ্য উধাওয়ের ঘটনাটি এখন ডিজিটাল জালিয়াতি বা পরিকল্পিত চুরির ইঙ্গিত দিচ্ছে এরপর ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর পণ্যের ডেলিভারির বিষয়ে অবহিতকরণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজারকে আরও একটি চিঠির মাধ্যমে এ বিষয়ে অনুরোধ করা হয়। গত বছরের (২০২৫ সাল) ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেওয়া চিঠির জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি অবহিত করে এবং বলে যে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে কনটেইনারটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কনটেইনারটি হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।

কাস্টমস সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পণ্যটি ডেলিভারি দিতে না পারায় সরকার তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর বিডার জমাকৃত ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত প্রদানের জন্য আবেদন করে। এ অবস্থায় নিলামে বিক্রিত পণ্য চালানটির বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য ওই অর্থ সোনালী ব্যাংকের নিলাম শাখার ব্যাংক হিসাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনারের অনুকূলে পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়।

অথচ কাস্টমস আইন-২০২৩ এর ধারা-৮ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের হেফাজতকারি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত। একই আইনের ধারা-১৩০ অনুযায়ী, ওয়্যারহাউজ (কাস্টমস বন্দর) রক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত। যার মধ্যে রয়েছে, সরকারি ওয়্যারহাউজে রক্ষিত পণ্যের ক্ষেত্রে ওয়্যারহাউজ রক্ষক এবং বেসরকারি ওয়‍্যারহাউজে রক্ষিত পণ্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সধারী, পণ্যের শুল্কায়নকারী কাস্টমস কর্মকর্তা পণ্যের পরিমাণ, ওজন অথবা পরিমাপ বিষয়টি দেখবেন। এছাড়া, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১২৫ ধারায় ঘাটতিসহ ছাড়করণ, ওয়্যারহাউজে পণ্যে যথাযথভাবে গ্রহণ, সরবরাহ ও জমা থাকাকালীন নিরাপদ হেফাজতের জন্য দায়িত্ব ওয়‍্যারহাউজের বা বন্দর কর্তৃপক্ষের। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এবং নিলামে বিক্রিত ও সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধিত পণ্য যদি বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যায়, তাহলে দায় কার?

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি দুটি কনটেইনার খুঁজে না পাওয়ার তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নিলামে অংশ নিয়ে কনটেইনার দুটি কেনার পর কাস্টমস শুল্কসহ সবধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত পণ্য বুঝে পাননি ক্রেতা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলামে প্রায় ২৭ টন কাপড়ভর্তি একটি কনটেইনার ৮৫ লাখ টাকায় কিনে নেয়। নিলামের আগে ক্রেতা কনটেইনারের ভেতরের পণ্য সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরে শুল্ক, নিলামমূল্য ও বন্দর চার্জ বাবদ মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্রাক নিয়ে পণ্য খালাসের জন্য বন্দর ইয়ার্ডে গেলে তাকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট কনটেইনারটি সেখানে নেই। বিষয়টি জানার পরপরই তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। ওই ঘটনার পর ১০ মাস পার হলেও কনটেইনারটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

কাস্টমস আইন অনুযায়ী পণ্যের হেফাজতকারী হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়বদ্ধ থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেনি। কাস্টমস ও বন্দরের মধ্যে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হলেও কার্যত কোনো সমাধান মেলেনি। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন ঝুলে থাকায় ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইতোমধ্যে দুদকের অভিযানে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বন্দরের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে

সার্বিক বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য যদি বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যায়,এটা বন্দর কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। বিডার সব টাকা পরিশোধ করার পরও পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পারা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সরকারও প্রাপ্য রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় বিক্রি হওয়া পণ্য যদি রাষ্ট্রই ডেলিভারি দিতে না পারে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দুদকের অভিযান ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিলামে বিক্রি হওয়া অন্তত দেড় কোটি টাকার কাপড়ের দুটি কনটেইনার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত ২৮ আগস্ট বন্দরে অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলে। 

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কোটি টাকার বেশি মূলধন প্রায় সাত মাস ধরে আটকে থাকায় আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বারবার চিঠি দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছি না।’ এমন ঘটনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে বলেও মনে করেন তিনি। এফ এম আবদুর রহমান মাসুম, ঢাকা পোস্ট.

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


নিলামের কনটেইনার উধাও, দায় কার?

প্রকাশের তারিখ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

দৃষ্টি অনলাইন: আইন লঙ্ঘনের দায়ে খালাস না হওয়া পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলো রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। কাস্টমস আইন-১৯৬৯-এর ৮২ ধারা অনুযায়ী, এসব পণ্য নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে, নিলামে বিক্রি হওয়ার পর যদি পণ্যভর্তি কনটেইনার রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়, তাহলে পুরো নিলাম প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে নিলাম হওয়া একটি কনটেইনারকে কেন্দ্র করে এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ই-অকশনের মাধ্যমে ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ওই কনটেইনারটিতে ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি (৪৭৮ রোল) ইনডিগো রঙের ফেব্রিক্স ছিল। বিডার পে-অর্ডার ও এ-চালানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে পণ্য বুঝে নিতে গিয়ে বাধে বিপত্তি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পণ্যভর্তি ওই কনটেইনারটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রিত পণ্যের মূল্যসহ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। কিন্তু দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিঠি চালাচালি চললেও কনটেইনারটির সন্ধান মেলেনি।

চট্টগ্রাম বন্দরে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিলাম হওয়া পণ্য আমদানিকারক বা বিডার বুঝে পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ১ কোটি ৬ লাখ টাকা মূল্যের ফেব্রিক্স ভর্তি একটি কনটেইনার ই-অকশনে বিক্রি হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করতে পারেনি। বিডার পে-অর্ডারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ জানায় কনটেইনারটির কোনো হদিস মিলছে না। এমন ঘটনা বন্দরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি আরও দুটি কনটেইনার উধাও হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিলামে অংশ নেওয়া বিডার শুল্কসহ সবধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত পণ্য বুঝে পাননি ক্রেতা। সুরক্ষিত এই বন্দরে পণ্য উধাওয়ের এমন ঘটনা এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিবেদন পেলে নির্ধারণ করা হবে গাফিলতি কার ছিল। এরপর দায়ীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নথিপত্রে যা আছে

কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাওয়া নথিপত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য চালান ডেলিভারি প্রদান করতে না পারায় নিলামে বিক্রিত পণ্যের বিপরীতে বিডার পরিশোধিত অর্থ ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধের জন্য অনুরোধ করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, বিল অব লেটারের মাধ্যমে আমদানিকৃত ২৫ হাজার ৬২৬ কেজি ফেব্রিক্স (৪৭৮ রোল) কালার-ইনডিগো জাতীয় পণ্য ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ই-অকশনে ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। যার মধ্যে বিড মূল্য ছিল ৮৪ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, অগ্রিম আয়কর ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং ভ্যাট ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০০ টাকা অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে বিডার অনুকূলে ডিও ইস্যু করা হয়। বিডার মোট ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা পে-অর্ডার ও এ-চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। পণ্য গ্রহণকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উক্ত কনটেইনার বিডারের অনুকূলে ডেলিভারি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

২০২৫ সালের আগস্টেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের আরও দুটি কাপড়ভর্তি কনটেইনার রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে কেনা পণ্যের জন্য ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেও শেষ পর্যন্ত বন্দর ইয়ার্ডে গিয়ে কনটেইনারের সন্ধান পায়নি। সুরক্ষিত এই রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ভেতর থেকে পণ্য উধাওয়ের ঘটনাটি এখন ডিজিটাল জালিয়াতি বা পরিকল্পিত চুরির ইঙ্গিত দিচ্ছে এরপর ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর পণ্যের ডেলিভারির বিষয়ে অবহিতকরণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজারকে আরও একটি চিঠির মাধ্যমে এ বিষয়ে অনুরোধ করা হয়। গত বছরের (২০২৫ সাল) ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেওয়া চিঠির জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি অবহিত করে এবং বলে যে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে কনটেইনারটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কনটেইনারটি হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।

কাস্টমস সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পণ্যটি ডেলিভারি দিতে না পারায় সরকার তার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর বিডার জমাকৃত ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত প্রদানের জন্য আবেদন করে। এ অবস্থায় নিলামে বিক্রিত পণ্য চালানটির বিপরীতে সরকারের প্রাপ্য ওই অর্থ সোনালী ব্যাংকের নিলাম শাখার ব্যাংক হিসাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনারের অনুকূলে পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে জমা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়।

অথচ কাস্টমস আইন-২০২৩ এর ধারা-৮ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের হেফাজতকারি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত। একই আইনের ধারা-১৩০ অনুযায়ী, ওয়্যারহাউজ (কাস্টমস বন্দর) রক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত। যার মধ্যে রয়েছে, সরকারি ওয়্যারহাউজে রক্ষিত পণ্যের ক্ষেত্রে ওয়্যারহাউজ রক্ষক এবং বেসরকারি ওয়‍্যারহাউজে রক্ষিত পণ্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সধারী, পণ্যের শুল্কায়নকারী কাস্টমস কর্মকর্তা পণ্যের পরিমাণ, ওজন অথবা পরিমাপ বিষয়টি দেখবেন। এছাড়া, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১২৫ ধারায় ঘাটতিসহ ছাড়করণ, ওয়্যারহাউজে পণ্যে যথাযথভাবে গ্রহণ, সরবরাহ ও জমা থাকাকালীন নিরাপদ হেফাজতের জন্য দায়িত্ব ওয়‍্যারহাউজের বা বন্দর কর্তৃপক্ষের। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এবং নিলামে বিক্রিত ও সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধিত পণ্য যদি বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যায়, তাহলে দায় কার?

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের কাপড়ভর্তি দুটি কনটেইনার খুঁজে না পাওয়ার তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নিলামে অংশ নিয়ে কনটেইনার দুটি কেনার পর কাস্টমস শুল্কসহ সবধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও এখন পর্যন্ত পণ্য বুঝে পাননি ক্রেতা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শাহ আমানত ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলামে প্রায় ২৭ টন কাপড়ভর্তি একটি কনটেইনার ৮৫ লাখ টাকায় কিনে নেয়। নিলামের আগে ক্রেতা কনটেইনারের ভেতরের পণ্য সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরে শুল্ক, নিলামমূল্য ও বন্দর চার্জ বাবদ মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্রাক নিয়ে পণ্য খালাসের জন্য বন্দর ইয়ার্ডে গেলে তাকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট কনটেইনারটি সেখানে নেই। বিষয়টি জানার পরপরই তিনি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। ওই ঘটনার পর ১০ মাস পার হলেও কনটেইনারটির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

কাস্টমস আইন অনুযায়ী পণ্যের হেফাজতকারী হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়বদ্ধ থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করেনি। কাস্টমস ও বন্দরের মধ্যে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হলেও কার্যত কোনো সমাধান মেলেনি। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন ঝুলে থাকায় ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ইতোমধ্যে দুদকের অভিযানে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বন্দরের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে

সার্বিক বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে নিলামে বিক্রি হওয়া পণ্য যদি বন্দরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যায়,এটা বন্দর কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা। বিডার সব টাকা পরিশোধ করার পরও পণ্য বুঝিয়ে দিতে না পারা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শুধু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সরকারও প্রাপ্য রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় বিক্রি হওয়া পণ্য যদি রাষ্ট্রই ডেলিভারি দিতে না পারে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দুদকের অভিযান ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিলামে বিক্রি হওয়া অন্তত দেড় কোটি টাকার কাপড়ের দুটি কনটেইনার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় গত ২৮ আগস্ট বন্দরে অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলে। 

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কোটি টাকার বেশি মূলধন প্রায় সাত মাস ধরে আটকে থাকায় আমাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বারবার চিঠি দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছি না।’ এমন ঘটনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করবে বলেও মনে করেন তিনি। এফ এম আবদুর রহমান মাসুম, ঢাকা পোস্ট.


দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক মোহাম্মদ মহসীন প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত