ঢাকা    বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

যে ৮ কারণে মমতার ভূমিধস পরাজয়


প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

যে ৮ কারণে মমতার ভূমিধস পরাজয়
ছবি: দ্যা হিন্দু

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে-এমন বিশ্লেষণই উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষ করে একটি বিশ্লেষণে আটটি কারণকে সামনে আনা হয়েছে, যেগুলো মিলেই দলটির দুর্বলতার ভিত্তি তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রথমত, টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শাসকবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের প্রভাব বিস্তার, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সেবাবণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ এই অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে। ২০২১ সালের পর এই অসন্তোষ নিরসনের সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে। চিটফান্ড থেকে শুরু করে নিয়োগ, রেশন, কয়লা ও গরু পাচার—একাধিক ইস্যুতে দলের নেতাদের গ্রেপ্তার জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়-কে ঘিরে বিপুল অর্থ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর)। এতে ভুয়া ও অপ্রাসঙ্গিক নাম বাদ পড়ায় তথাকথিত ‘ম্যানেজড ভোট’-এর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি অংশ তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ তৃণমূলের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলেছে।

চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। ভারতীয় জনতা পার্টি এই ইস্যুকে সামনে এনে সংখ্যাগুরু ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় বলে মনে করা হচ্ছে।

পঞ্চমত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর সক্রিয় ভূমিকা এবং ব্যাপক প্রশাসনিক রদবদল রাজ্য সরকারের প্রভাব কমিয়ে দেয়।

ষষ্ঠত, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া অবস্থান এবং ভোটের আগে থেকেই তাদের সক্রিয়তা তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের রাজনীতি’কে নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে বিরোধীরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে প্রচার চালাতে সক্ষম হয়।

সপ্তমত, শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভোটগ্রহণ একটি বড় পরিবর্তন আনে। বহু বছরের অভিযোগ—ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার প্রবণতা—এই নির্বাচনে তেমন দেখা যায়নি। এতে বিরোধীদের ভোট বাড়ে এবং শাসকদলের প্রভাব কমে।

অষ্টমত, নির্বাচনের আগে তৃণমূলের কৌশলগত মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত I-PAC বা আই-প্যাকের কার্যক্রম হঠাৎ থেমে যাওয়া বড় ধাক্কা দেয়। সংস্থাটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দলের নিজস্ব সাংগঠনিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলেছিল বলে দলের ভেতরেই মত রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই আটটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থানকে নড়বড়ে করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির সামনে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


যে ৮ কারণে মমতার ভূমিধস পরাজয়

প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬

featured Image

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে-এমন বিশ্লেষণই উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষ করে একটি বিশ্লেষণে আটটি কারণকে সামনে আনা হয়েছে, যেগুলো মিলেই দলটির দুর্বলতার ভিত্তি তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রথমত, টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শাসকবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের প্রভাব বিস্তার, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সেবাবণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ এই অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে। ২০২১ সালের পর এই অসন্তোষ নিরসনের সুযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির অভিযোগ তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে। চিটফান্ড থেকে শুরু করে নিয়োগ, রেশন, কয়লা ও গরু পাচার—একাধিক ইস্যুতে দলের নেতাদের গ্রেপ্তার জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়-কে ঘিরে বিপুল অর্থ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর)। এতে ভুয়া ও অপ্রাসঙ্গিক নাম বাদ পড়ায় তথাকথিত ‘ম্যানেজড ভোট’-এর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি অংশ তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ তৃণমূলের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলেছে।

চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। ভারতীয় জনতা পার্টি এই ইস্যুকে সামনে এনে সংখ্যাগুরু ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় বলে মনে করা হচ্ছে।

পঞ্চমত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর সক্রিয় ভূমিকা এবং ব্যাপক প্রশাসনিক রদবদল রাজ্য সরকারের প্রভাব কমিয়ে দেয়।

ষষ্ঠত, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া অবস্থান এবং ভোটের আগে থেকেই তাদের সক্রিয়তা তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের রাজনীতি’কে নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে বিরোধীরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে প্রচার চালাতে সক্ষম হয়।

সপ্তমত, শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভোটগ্রহণ একটি বড় পরিবর্তন আনে। বহু বছরের অভিযোগ—ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল বা ভোটারদের বাধা দেওয়ার প্রবণতা—এই নির্বাচনে তেমন দেখা যায়নি। এতে বিরোধীদের ভোট বাড়ে এবং শাসকদলের প্রভাব কমে।

অষ্টমত, নির্বাচনের আগে তৃণমূলের কৌশলগত মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত I-PAC বা আই-প্যাকের কার্যক্রম হঠাৎ থেমে যাওয়া বড় ধাক্কা দেয়। সংস্থাটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দলের নিজস্ব সাংগঠনিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলেছিল বলে দলের ভেতরেই মত রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই আটটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থানকে নড়বড়ে করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির সামনে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।



দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত