ঢাকা    বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

বউভাতের উৎসব থেকে কবর খোঁড়ার ট্র্যাজেডি


প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

বউভাতের উৎসব থেকে কবর খোঁড়ার ট্র্যাজেডি

বাগেরহাট প্রতিনিধি :

আজ শুক্রবার নামাজের পর বউভাতের আড্ডা, আনন্দ, হাসি-ঠাট্টা-এ সব কিছু হওয়ার কথা ছিল। খোলাখুলি বর্ণিল আয়োজন, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়ে নবদম্পতির আনন্দে মেতে উঠতে পারতেন। নতুন বউ মিতু এবং বর সাব্বির বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত দিয়ে আয়োজনকে উৎসবে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দ আজ কেবল স্মৃতির মধ্যেই রয়ে গেছে। 

বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজে সড়কে নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪টিই শিশু। তাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের কম। নিহত হয়েছেন তাদের মায়েরাও।

গাড়িতে শিশুদের শান্ত রাখতে মায়েরা হয়তো চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মা-সন্তান কেউই এখন আর বেঁচে নেই। দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সেই চুষনি যেন মর্মান্তিক ঘটনাটির নীরব সাক্ষী।

দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পরও শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক জনতা। কেউ কেউ ভয়াবহতা উপলব্ধি করে শিউরে উঠছিলেন, কেউ আফসোস করে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ব্যথা উপলব্ধির চেষ্টা করছিলেন।

সকালে দুর্ঘটনাস্থলে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরা, জুতা ও অন্যান্য জিনিস পরে থাকতে দেখা গেছে। 

দুর্ঘটনার পর এলাকায় নেমে আসে নিস্তব্ধতা। যেখানে আনন্দ ও হাসি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে স্বজনরা কবর খোঁড়া ও শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মিতুর সঙ্গে ছিল ছোট বোন লামিয়া (১২), দাদি রাশিদা (৭৫), নানি আনোয়ারা (৭০)। সাব্বিরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৭০), মা আঞ্জুমানারা (৬০), বোন ঐশী (৩০), বড় ভাবি পুতুল (৩০) ও তিন নাতি-নাতনি।

পরিবারের আহাজারি এবং এলাকাবাসীর চোখে অশ্রু থামছে না। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে হারানো জনি শুধু বলছেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সন্তান, ভাই-বোন—সবই হারালাম। আমি একা হয়ে গেলাম।”

এদিকে, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো পৌঁছেছে। খুমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের সারি, স্বজনদের আহাজারি, শোকময় কান্না পুরো এলাকা ভারী করে দিয়েছে।

আজকের দিনটি, যা বউভাতের আনন্দে ভরে থাকার কথা ছিল, সে আনন্দকে কবর খোঁড়ার শোকে ঢেলে দিয়েছে। ১৪টি প্রাণের এই মর্মান্তিক ক্ষতি দুই পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে। নিহতদের জানাজা শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই দুর্ঘটনা পুরো এলাকা, পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য এক শোকস্তব্ধ স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে-যেখানে আনন্দের আয়োজনের কথা ছিল, সেখানে আজ কেবল কান্না আর কবর খোঁড়ার দৃশ্য।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬


বউভাতের উৎসব থেকে কবর খোঁড়ার ট্র্যাজেডি

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

বাগেরহাট প্রতিনিধি :

আজ শুক্রবার নামাজের পর বউভাতের আড্ডা, আনন্দ, হাসি-ঠাট্টা-এ সব কিছু হওয়ার কথা ছিল। খোলাখুলি বর্ণিল আয়োজন, আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়ে নবদম্পতির আনন্দে মেতে উঠতে পারতেন। নতুন বউ মিতু এবং বর সাব্বির বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত দিয়ে আয়োজনকে উৎসবে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দ আজ কেবল স্মৃতির মধ্যেই রয়ে গেছে। 

বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজে সড়কে নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪টিই শিশু। তাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরের কম। নিহত হয়েছেন তাদের মায়েরাও।

গাড়িতে শিশুদের শান্ত রাখতে মায়েরা হয়তো চুষনি মুখে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মা-সন্তান কেউই এখন আর বেঁচে নেই। দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সেই চুষনি যেন মর্মান্তিক ঘটনাটির নীরব সাক্ষী।

দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পরও শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক জনতা। কেউ কেউ ভয়াবহতা উপলব্ধি করে শিউরে উঠছিলেন, কেউ আফসোস করে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ব্যথা উপলব্ধির চেষ্টা করছিলেন।

সকালে দুর্ঘটনাস্থলে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরা, জুতা ও অন্যান্য জিনিস পরে থাকতে দেখা গেছে। 

দুর্ঘটনার পর এলাকায় নেমে আসে নিস্তব্ধতা। যেখানে আনন্দ ও হাসি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে স্বজনরা কবর খোঁড়া ও শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মিতুর সঙ্গে ছিল ছোট বোন লামিয়া (১২), দাদি রাশিদা (৭৫), নানি আনোয়ারা (৭০)। সাব্বিরের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৭০), মা আঞ্জুমানারা (৬০), বোন ঐশী (৩০), বড় ভাবি পুতুল (৩০) ও তিন নাতি-নাতনি।

পরিবারের আহাজারি এবং এলাকাবাসীর চোখে অশ্রু থামছে না। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে হারানো জনি শুধু বলছেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রীর সন্তান, ভাই-বোন—সবই হারালাম। আমি একা হয়ে গেলাম।”

এদিকে, নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো পৌঁছেছে। খুমেক হাসপাতালের মর্গের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের সারি, স্বজনদের আহাজারি, শোকময় কান্না পুরো এলাকা ভারী করে দিয়েছে।

আজকের দিনটি, যা বউভাতের আনন্দে ভরে থাকার কথা ছিল, সে আনন্দকে কবর খোঁড়ার শোকে ঢেলে দিয়েছে। ১৪টি প্রাণের এই মর্মান্তিক ক্ষতি দুই পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে। নিহতদের জানাজা শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই দুর্ঘটনা পুরো এলাকা, পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবের জন্য এক শোকস্তব্ধ স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে-যেখানে আনন্দের আয়োজনের কথা ছিল, সেখানে আজ কেবল কান্না আর কবর খোঁড়ার দৃশ্য।


দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত