ঢাকা    সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

জ্বালানি সংকটে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কি ?


প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

জ্বালানি সংকটে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কি ?

মোকাররম মামুন

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাত থেকে আসে। শুধু তাই না, এই শিল্পের সাথে জড়িত দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানী সংকট এই শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কি বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।

সেলাই মেশিনে তৈরি বস্ত্র ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় ১৭৫৫ সালে। যদিও আমাদের দেশে এর ব্যবহার শুরু হয় অনেক পরে। তবে, দেশে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু ১৯৬০ সালে। ঢাকার উর্দুরোডে রিয়াজ স্টোর নামে একটি ছোট দর্জির কারখানা থেকে স্থানীয় বাজারে কাপড় সরবরাহ করতো। ১৯৭৩ সালে নাম পরিবর্তন করে মেসার্স রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক একটি ফার্মের সাথে ১৩ মিলিয়ন ফ্রাংক মূল্যের ১০ হাজার পিস ছেলেদের শার্ট রপ্তানি করে। যা ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রথম সরাসরি পোশাক রপ্তানি। 

১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংস্থাপন, বর্তমান জনপ্রশাসনের তৎকালীণ সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদের খান দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েগু কর্পোরেশনের সহায়তায় প্রথম যৌথ উদ্যোগে নন-ইকুইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ গার্মেন্টস ও দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েয়ু কর্পোরেশনের মধ্যে প্রযুক্তিগত এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মেশিনে কাজ করার মতো উপযোগী করে তোলার জন্য প্রথমে শ্রমিকদের এবং পরে পরিদর্শকদের দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরাই ১৯৮০ সালে উৎপাদন শুরু করে। মেসার্স রিয়াজ গার্মেন্টস প্রথম বাংলাদেশ থেকে পোশাক বিদেশে রপ্তানি করলেও দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড ছিল প্রথম শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানি। 

১৯৮০ সালে ইয়াঙ্গুন নামে অপর একটি কোরিয়ান কর্পোরেশন বাংলাদেশি ট্রেকসীম লিমিটেড নামে অপর একটি কোম্পানির সঙ্গে প্রথম যৌথ উদ্যোগে তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে তোলে। বাংলাদেশি অংশীদাররা নতুন প্রতিষ্ঠান ইয়াঙ্গুনস বাংলাদেশ-এ শতকরা ৫১ ভাগ ইকুইটির মালিক হয়। ট্রেকসীম লিমিটেড ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে প্যাডেড এবং নন-প্যাডেড জ্যাকেট সুইডেনে রপ্তানি করে। গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রকৃতপক্ষে ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেইড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পদচারণা আরম্ভ হয়। 

ধীরে ধীরে চলতে শুরু কওে দেশের পোশাক শিল্প। মাত্র ১০ বৎসরের ব্যবধানে ১৯৯২-৯৩ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১ হাজার ৪৪৫ মিলিয়ন ইউ.এস ডলারে উন্নীত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশে তৈরি কাপড় এবং পোশাকের গুণগত মানের দিক থেকে নজর কাড়তে থাকে পুরো বিশে^র। দিন দিন পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বেড়েই চলছে। যেখানে ২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বমোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২১ হাজার ৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। রপ্তানি আয়ের সাথে দেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও বাড়ে। সে সময় বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের উপর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। ৯০ দশকের পর পোশাক শিল্পে নারীদের অন্তর্ভুক্তি এই শিল্পকে আরো গতিশীল করে তোলে।

৬০ দশক থেকে ২০ দশক। হাটি-হাটি, পা-পা। পোশাক খাত থেকে পোশাক শিল্প। বড় একটা সময়। নানা প্রতিবন্ধকতা। এরমধ্যে অতীত হয়েছে এ শিল্পের স্বর্ণযুগ। তবে, নির্দিষ্ট কোন বছর নয়। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়কে পোশাক শিল্পের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, কোভিড-১৯ এর পর থেকে যেন এ শিল্পের প্রতিবন্ধকতা তার আর পর নেই অবস্থা। তাহলে কি দেশের পোশাক শিল্পের স্বর্ণযুগ অতীত থাকবে, না-কি এ যুগের প্রসারে যুক্ত হবে ভবিষ্যতও।

১৯৬০ সালে নবজাতক শিশুর মতো থাকা পোশাক খাত এক সময় পরিপূর্ণ যুবক হয়ে যৌবনে অর্জন করেছে শিল্পখাত। খ্যাতি পেয়েছে একটি যুগের। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এ শিল্পের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে দাড়ায়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক, আহত হন কয়েক হাজার। যে শ্রমিকদের কষ্টের লোনা জ¦লে দাড়িয়েছে এ শিল্প, সে শিল্পের শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করার অভিযোগ তোলে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নেন বিদেশী বায়াররা। সাথে যুক্ত হয়, কর্ম-পরিবেশ ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দেওয়ার বিষয়। এদিকে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পার হলেও আজও এক অদৃশ্য শক্তির কাছে অনিশ্চয়তায় আটকে আছে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বিচার। 

এক সময় দেশের আয়ের প্রধান উৎস পাট ও পাটজাত দ্রব্যকে পেছনে ফেলে বীর দর্পের মতো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া পোশাক শিল্প নিয়ে শুরু হয় দেশী-ও বিদেশী ষড়যন্ত্র। প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়ায় নানা ইস্যু। প্রথমে বাংলাদেশকে বর্জন করার কথা উঠলেও তৎকালীন সরকার অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত ট্রান্সন্যাশনাল গভর্ন্যান্স গঠন করে এবং এদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স তার সদস্য কারখানাগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে এর অবকাঠামো, অগ্নিনির্বাপণ ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। 

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমের মেয়াদ শেষে স্থলাভিষিক্ত হয় বিজিএমইএ প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত ‘আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল’। পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন, পেশাগত ও স্বার্থ নিরাপত্তা নীতি ২০১৩ এবং শ্রমিকনীতি ২০১৫ সংস্কার করা হয়। সাথে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়।

আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্প। ধীরে ধীরে মাত্র ছয় বছরে উচ্চ হারে উন্নতির প্রায় শিখরে যাওয়াবস্থায় এ শিল্পকে চরমভাবে আঘাত করে করোনা-১৯। অনেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় এ শিল্পকে। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২০১৯ সালের মে মাসের প্রথম ২৯ দিনের তুলনায় ২০২০ সালের মে মাসের প্রথম ২৯ দিনে কমে যায় ৬২ শতাংশ। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তৎকালীণ সরকার করোনাকালের সম্ভাব্য অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৫৯০ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা করে। মহামারির দুই বছর পর আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে। 

পোশাক কারখানা মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র মতে, সম্প্রতি তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানা গঠনে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। গেল ২০২৫ সালে ৩৮টি ফ্যাক্টরি সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে বিশে^ রেকর্ড পরিমাণ লিড সার্টিফিকেট অর্জনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ২৭০টি সবুজ কারখানা রয়েছে বাংলাদেশে। 

ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল বা ইউএসজিবিসি এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানার সার্টিফিকেশন দিয়ে থাকে। সেই ইউএসজিবিসি তথ্যমতে, দেশে এখন সবুজ কারখানা ২৭০টি। এর মধ্যে গোল্ড ক্যাটাগরির ১৩৭, প্লাটিনাম ১১৪, সিলভার ১৫ ও সার্টিফাইড ক্যাটাগরির ৪ টি। এছাড়া, ৫৫০টির বেশি কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরি হতে পাইপলাইনে রয়েছে। 

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩৮টি কারখানা। এর আগে ২০২৪ সালে ২৬টি, ২০২৩ সালে ২৪টি, ২০২২ সালে ৩০টি, ২০২১ সালে ২৪টি, ২০২০ সালে ২৩টি ও ২০১৯ সালে ২৮টি ফ্যাক্টরি সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। বিশে^র শীর্ষ ১০০টি পোশাক কারখানার মধ্যে বাংলাদেশেই রয়েছে ৬৮টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাকিস্তানে রয়েছে ৭টি ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে ৬টি।

কোন এক অদৃশ্য অশুভ শক্তি যেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পিছু ছাড়ছেনা। একের পর এক প্রতিবন্ধকতায় বার বার ধাক্কা খাচ্ছে সবচেয়ে বড় রপ্তানিকরা এ খাত। সবশেষ ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ যুদ্ধে সৃষ্ট জ¦ালানী সংকটে অনেকটাই মুখ থুবড়ে পরা অবস্থা এ শিল্পের। বিশেষ করে অতিরিক্ত লোডশেডিং আর তেলের অভাবে বায়ারদের কাছ থেকে পাওয়া কাজ ঠিকমতো না দিতে পারা এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। 

গত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পোশাক শিল্প খাত। করোনা মহামারির পর ডলার সংকটের কারণে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ সরবরাহও কমে গেছে। এরই মধ্যে ইরান যুদ্ধের বরিূপপ্রভাবে জ¦ালানী পক্ষান্তরে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। 

পোশাক মালিকরা বলছেন, আগে দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। এখন সেটা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে তারা জেনারেটর চালিয়ে কারখানার কাজ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তেল দিয়ে দীর্ঘ সময় কারখানা সচল রাখতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ-ডিজেল মিলিয়ে প্রতি মাসে যেখানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার মতো খরচ হতো সেখানে জেনারেটর চালানোর কারণে বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। তবে ইপিজেড এলাকায় যেসব পোশাক কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তুলনামূলকভাবে কম বলে জানান।

গার্মেন্ট মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানাযায়, বাংলাদেশে বর্তমানে আড়াই হাজারের মতো রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা রয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বাইরে বলে জানিয়েছে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। ফলে তারা ইপিজেড এলাকার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়িনোর প্রভাবে পণ্যের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। 

এছাড়া জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি পোশাকখাতে কাঁচামাল, পরিবহন ব্যয়সহ আরও অনেক খরচ বেড়ে গেছে। কাপড়ের কাঁচামাল তুলা আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিকেজিতে ৬০ সেন্টস বা প্রায় আড়াইশ' টাকা বেড়েছে। এছাড়া পলিস্টার ও নাইলনের মতো পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দাম তো হু হু করে বাড়ছে। বায়ারদেরকে বৈশি^ক পরিস্থিতিতে জ¦ালানীর দাম বৃদ্ধির ফলে খরচ বাড়ার কথা বললে তারা বলছে তেলের দাম বৃদ্ধির আগে অর্ডার দেওয়া। দাম বেড়েছে এখন এই বলে রাজি হচ্ছেনা। নতুন দামে অর্ডার কোট করার পর দেখা যাচ্ছে, বায়াররা অর্ডারটা কনফার্ম করছে না। দাম কমানোর জন্য অপেক্ষা করছে। সব মিলিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া ব্যবসায়ীরা রয়েছেন প্রচন্ড চাঁপে। 

আগেই বলেছি, কোন এক অশুভ ছাঁয়া বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পিছু ছাড়ছে না। বর্তমান বৈশি^ক পরিস্থিতি অর্থাৎ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরালের মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ না হলে দেশের পোশাক খাত অনেকটাই বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা যে হবে না তা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে, শুনিয়েছেন আশার বাণী। বলেছেন, সমস্যার সমাধান করতে হবে দ্রুত। 

বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তুক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠা এই শিল্পের বাজার বাড়তি মূল্যের কারণে ক্রেতা হারানোর শঙ্কা ব্যবসায়ীদের মাঝে বিরাজমান। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না করতে পারলে আর তেল সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায় না আনতে পারলে সময় মতো মাল প্রস্তুত করে দেওয়া সম্ভব হবেনা। ফলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখাটা সম্ভব হবে কি-না ভেবে দেখতে হবে। 

শুধু বিদ্যুৎ বা জ¦ালানী বা রাজনৈতিক অস্থিরতাই সমস্যা নয়, এখনো এ শিল্পের অগ্রগতিতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা। অর্থাৎ, পোশাক তৈরির সুতা, কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। সাথে শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকায় উচ্চমানের ও বৈচিত্রময় পোশাক উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। 

২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের মতো দুর্ঘটনাকে এখনো কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিকের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন অনুকুল নয় বলে বায়াররা প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে মূল্য ও মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০-এর বেশি ধরনের পোশাকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ সীমিত ধরনের পোশাক রপ্তানি করে। এমতাবস্থায় পোশাক শিল্পের উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য বা এ শিল্পের আহূত সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা।

প্রথমতো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ অটোমেশন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদনে জোর দেওয়া। যেমন, সুতা ও কাপড়ের দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। তৃতীয়ত, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র উদ্যোগে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে শ্রমিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। যদিও ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক লিড-সার্টিফাইড সবুজ পোশাক কারখানা রয়েছে। পঞ্চমত, শুধু ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে। সর্বোপরি যে কোন উপায়ে জ¦ালানী বা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।

মেইড ইন বাংলাদেশ শুধু একটি স্টিকার বা লেবেল নয়। এটি একটি জাতির সংগ্রাম, সাফল্য আর স্বপ্নের প্রতীক। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাখ লাখ শ্রমিকের হাতের স্পর্শ, উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতায় আর সরকারের সহায়ক নীতিতে। যেহেত পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির মুল চালিকা শক্তি সেহেতু, এই শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে সরকার বিশেষ নজর দিয়ে শিল্পটির সুনাম সমুন্ন রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলেই আমাদের বিশ^াস।


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬


জ্বালানি সংকটে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কি ?

প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মোকাররম মামুন

পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাত থেকে আসে। শুধু তাই না, এই শিল্পের সাথে জড়িত দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানী সংকট এই শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ কি বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।

সেলাই মেশিনে তৈরি বস্ত্র ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় ১৭৫৫ সালে। যদিও আমাদের দেশে এর ব্যবহার শুরু হয় অনেক পরে। তবে, দেশে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু ১৯৬০ সালে। ঢাকার উর্দুরোডে রিয়াজ স্টোর নামে একটি ছোট দর্জির কারখানা থেকে স্থানীয় বাজারে কাপড় সরবরাহ করতো। ১৯৭৩ সালে নাম পরিবর্তন করে মেসার্স রিয়াজ গার্মেন্টস লিমিটেড নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক একটি ফার্মের সাথে ১৩ মিলিয়ন ফ্রাংক মূল্যের ১০ হাজার পিস ছেলেদের শার্ট রপ্তানি করে। যা ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রথম সরাসরি পোশাক রপ্তানি। 

১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংস্থাপন, বর্তমান জনপ্রশাসনের তৎকালীণ সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদের খান দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েগু কর্পোরেশনের সহায়তায় প্রথম যৌথ উদ্যোগে নন-ইকুইটি ফার্ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ গার্মেন্টস ও দক্ষিণ কোরিয়ার দায়েয়ু কর্পোরেশনের মধ্যে প্রযুক্তিগত এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। মেশিনে কাজ করার মতো উপযোগী করে তোলার জন্য প্রথমে শ্রমিকদের এবং পরে পরিদর্শকদের দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরাই ১৯৮০ সালে উৎপাদন শুরু করে। মেসার্স রিয়াজ গার্মেন্টস প্রথম বাংলাদেশ থেকে পোশাক বিদেশে রপ্তানি করলেও দেশ গার্মেন্টস লিমিটেড ছিল প্রথম শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানি। 

১৯৮০ সালে ইয়াঙ্গুন নামে অপর একটি কোরিয়ান কর্পোরেশন বাংলাদেশি ট্রেকসীম লিমিটেড নামে অপর একটি কোম্পানির সঙ্গে প্রথম যৌথ উদ্যোগে তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে তোলে। বাংলাদেশি অংশীদাররা নতুন প্রতিষ্ঠান ইয়াঙ্গুনস বাংলাদেশ-এ শতকরা ৫১ ভাগ ইকুইটির মালিক হয়। ট্রেকসীম লিমিটেড ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে প্যাডেড এবং নন-প্যাডেড জ্যাকেট সুইডেনে রপ্তানি করে। গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে প্রকৃতপক্ষে ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেইড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পদচারণা আরম্ভ হয়। 

ধীরে ধীরে চলতে শুরু কওে দেশের পোশাক শিল্প। মাত্র ১০ বৎসরের ব্যবধানে ১৯৯২-৯৩ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১ হাজার ৪৪৫ মিলিয়ন ইউ.এস ডলারে উন্নীত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলাদেশে তৈরি কাপড় এবং পোশাকের গুণগত মানের দিক থেকে নজর কাড়তে থাকে পুরো বিশে^র। দিন দিন পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বেড়েই চলছে। যেখানে ২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বমোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৮৯.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২১ হাজার ৫১৫.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। রপ্তানি আয়ের সাথে দেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও বাড়ে। সে সময় বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের উপর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল। ৯০ দশকের পর পোশাক শিল্পে নারীদের অন্তর্ভুক্তি এই শিল্পকে আরো গতিশীল করে তোলে।

৬০ দশক থেকে ২০ দশক। হাটি-হাটি, পা-পা। পোশাক খাত থেকে পোশাক শিল্প। বড় একটা সময়। নানা প্রতিবন্ধকতা। এরমধ্যে অতীত হয়েছে এ শিল্পের স্বর্ণযুগ। তবে, নির্দিষ্ট কোন বছর নয়। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়কে পোশাক শিল্পের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, কোভিড-১৯ এর পর থেকে যেন এ শিল্পের প্রতিবন্ধকতা তার আর পর নেই অবস্থা। তাহলে কি দেশের পোশাক শিল্পের স্বর্ণযুগ অতীত থাকবে, না-কি এ যুগের প্রসারে যুক্ত হবে ভবিষ্যতও।

১৯৬০ সালে নবজাতক শিশুর মতো থাকা পোশাক খাত এক সময় পরিপূর্ণ যুবক হয়ে যৌবনে অর্জন করেছে শিল্পখাত। খ্যাতি পেয়েছে একটি যুগের। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এ শিল্পের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে দাড়ায়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক, আহত হন কয়েক হাজার। যে শ্রমিকদের কষ্টের লোনা জ¦লে দাড়িয়েছে এ শিল্প, সে শিল্পের শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করার অভিযোগ তোলে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নেন বিদেশী বায়াররা। সাথে যুক্ত হয়, কর্ম-পরিবেশ ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দেওয়ার বিষয়। এদিকে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পার হলেও আজও এক অদৃশ্য শক্তির কাছে অনিশ্চয়তায় আটকে আছে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বিচার। 

এক সময় দেশের আয়ের প্রধান উৎস পাট ও পাটজাত দ্রব্যকে পেছনে ফেলে বীর দর্পের মতো উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়া পোশাক শিল্প নিয়ে শুরু হয় দেশী-ও বিদেশী ষড়যন্ত্র। প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়ায় নানা ইস্যু। প্রথমে বাংলাদেশকে বর্জন করার কথা উঠলেও তৎকালীন সরকার অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত ট্রান্সন্যাশনাল গভর্ন্যান্স গঠন করে এবং এদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স তার সদস্য কারখানাগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে এর অবকাঠামো, অগ্নিনির্বাপণ ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। 

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কার্যক্রমের মেয়াদ শেষে স্থলাভিষিক্ত হয় বিজিএমইএ প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত ‘আরএমজি সাসটেইনিবিলিটি কাউন্সিল’। পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন, পেশাগত ও স্বার্থ নিরাপত্তা নীতি ২০১৩ এবং শ্রমিকনীতি ২০১৫ সংস্কার করা হয়। সাথে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়।

আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্প। ধীরে ধীরে মাত্র ছয় বছরে উচ্চ হারে উন্নতির প্রায় শিখরে যাওয়াবস্থায় এ শিল্পকে চরমভাবে আঘাত করে করোনা-১৯। অনেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় এ শিল্পকে। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ২০১৯ সালের মে মাসের প্রথম ২৯ দিনের তুলনায় ২০২০ সালের মে মাসের প্রথম ২৯ দিনে কমে যায় ৬২ শতাংশ। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তৎকালীণ সরকার করোনাকালের সম্ভাব্য অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৫৯০ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা করে। মহামারির দুই বছর পর আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে। 

পোশাক কারখানা মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র মতে, সম্প্রতি তৈরি পোশাক রপ্তানির পাশাপাশি গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানা গঠনে নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। গেল ২০২৫ সালে ৩৮টি ফ্যাক্টরি সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে বিশে^ রেকর্ড পরিমাণ লিড সার্টিফিকেট অর্জনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ২৭০টি সবুজ কারখানা রয়েছে বাংলাদেশে। 

ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল বা ইউএসজিবিসি এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানার সার্টিফিকেশন দিয়ে থাকে। সেই ইউএসজিবিসি তথ্যমতে, দেশে এখন সবুজ কারখানা ২৭০টি। এর মধ্যে গোল্ড ক্যাটাগরির ১৩৭, প্লাটিনাম ১১৪, সিলভার ১৫ ও সার্টিফাইড ক্যাটাগরির ৪ টি। এছাড়া, ৫৫০টির বেশি কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরি হতে পাইপলাইনে রয়েছে। 

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩৮টি কারখানা। এর আগে ২০২৪ সালে ২৬টি, ২০২৩ সালে ২৪টি, ২০২২ সালে ৩০টি, ২০২১ সালে ২৪টি, ২০২০ সালে ২৩টি ও ২০১৯ সালে ২৮টি ফ্যাক্টরি সবুজ কারখানার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। বিশে^র শীর্ষ ১০০টি পোশাক কারখানার মধ্যে বাংলাদেশেই রয়েছে ৬৮টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাকিস্তানে রয়েছে ৭টি ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে ৬টি।

কোন এক অদৃশ্য অশুভ শক্তি যেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পিছু ছাড়ছেনা। একের পর এক প্রতিবন্ধকতায় বার বার ধাক্কা খাচ্ছে সবচেয়ে বড় রপ্তানিকরা এ খাত। সবশেষ ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ যুদ্ধে সৃষ্ট জ¦ালানী সংকটে অনেকটাই মুখ থুবড়ে পরা অবস্থা এ শিল্পের। বিশেষ করে অতিরিক্ত লোডশেডিং আর তেলের অভাবে বায়ারদের কাছ থেকে পাওয়া কাজ ঠিকমতো না দিতে পারা এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। 

গত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পোশাক শিল্প খাত। করোনা মহামারির পর ডলার সংকটের কারণে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ সরবরাহও কমে গেছে। এরই মধ্যে ইরান যুদ্ধের বরিূপপ্রভাবে জ¦ালানী পক্ষান্তরে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। 

পোশাক মালিকরা বলছেন, আগে দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। এখন সেটা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে ঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে তারা জেনারেটর চালিয়ে কারখানার কাজ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তেল দিয়ে দীর্ঘ সময় কারখানা সচল রাখতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ-ডিজেল মিলিয়ে প্রতি মাসে যেখানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার মতো খরচ হতো সেখানে জেনারেটর চালানোর কারণে বেড়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। তবে ইপিজেড এলাকায় যেসব পোশাক কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তুলনামূলকভাবে কম বলে জানান।

গার্মেন্ট মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানাযায়, বাংলাদেশে বর্তমানে আড়াই হাজারের মতো রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা রয়েছে। সেগুলোর বেশিরভাগই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বাইরে বলে জানিয়েছে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। ফলে তারা ইপিজেড এলাকার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে না। এর মধ্যে আবার সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়িনোর প্রভাবে পণ্যের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। 

এছাড়া জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি পোশাকখাতে কাঁচামাল, পরিবহন ব্যয়সহ আরও অনেক খরচ বেড়ে গেছে। কাপড়ের কাঁচামাল তুলা আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিকেজিতে ৬০ সেন্টস বা প্রায় আড়াইশ' টাকা বেড়েছে। এছাড়া পলিস্টার ও নাইলনের মতো পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দাম তো হু হু করে বাড়ছে। বায়ারদেরকে বৈশি^ক পরিস্থিতিতে জ¦ালানীর দাম বৃদ্ধির ফলে খরচ বাড়ার কথা বললে তারা বলছে তেলের দাম বৃদ্ধির আগে অর্ডার দেওয়া। দাম বেড়েছে এখন এই বলে রাজি হচ্ছেনা। নতুন দামে অর্ডার কোট করার পর দেখা যাচ্ছে, বায়াররা অর্ডারটা কনফার্ম করছে না। দাম কমানোর জন্য অপেক্ষা করছে। সব মিলিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া ব্যবসায়ীরা রয়েছেন প্রচন্ড চাঁপে। 

আগেই বলেছি, কোন এক অশুভ ছাঁয়া বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পিছু ছাড়ছে না। বর্তমান বৈশি^ক পরিস্থিতি অর্থাৎ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরালের মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ না হলে দেশের পোশাক খাত অনেকটাই বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা যে হবে না তা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে, শুনিয়েছেন আশার বাণী। বলেছেন, সমস্যার সমাধান করতে হবে দ্রুত। 

বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তুক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠা এই শিল্পের বাজার বাড়তি মূল্যের কারণে ক্রেতা হারানোর শঙ্কা ব্যবসায়ীদের মাঝে বিরাজমান। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না করতে পারলে আর তেল সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায় না আনতে পারলে সময় মতো মাল প্রস্তুত করে দেওয়া সম্ভব হবেনা। ফলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখাটা সম্ভব হবে কি-না ভেবে দেখতে হবে। 

শুধু বিদ্যুৎ বা জ¦ালানী বা রাজনৈতিক অস্থিরতাই সমস্যা নয়, এখনো এ শিল্পের অগ্রগতিতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা। অর্থাৎ, পোশাক তৈরির সুতা, কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। সাথে শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি থাকায় উচ্চমানের ও বৈচিত্রময় পোশাক উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। 

২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের মতো দুর্ঘটনাকে এখনো কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিকের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন অনুকুল নয় বলে বায়াররা প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে মূল্য ও মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে ১০০-এর বেশি ধরনের পোশাকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ সীমিত ধরনের পোশাক রপ্তানি করে। এমতাবস্থায় পোশাক শিল্পের উজ্জল ভবিষ্যতের জন্য বা এ শিল্পের আহূত সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা।

প্রথমতো, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ অটোমেশন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদনে জোর দেওয়া। যেমন, সুতা ও কাপড়ের দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। তৃতীয়ত, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র উদ্যোগে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে শ্রমিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। যদিও ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক লিড-সার্টিফাইড সবুজ পোশাক কারখানা রয়েছে। পঞ্চমত, শুধু ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হবে। সর্বোপরি যে কোন উপায়ে জ¦ালানী বা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।

মেইড ইন বাংলাদেশ শুধু একটি স্টিকার বা লেবেল নয়। এটি একটি জাতির সংগ্রাম, সাফল্য আর স্বপ্নের প্রতীক। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাখ লাখ শ্রমিকের হাতের স্পর্শ, উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতায় আর সরকারের সহায়ক নীতিতে। যেহেত পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির মুল চালিকা শক্তি সেহেতু, এই শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে সরকার বিশেষ নজর দিয়ে শিল্পটির সুনাম সমুন্ন রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলেই আমাদের বিশ^াস।



দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত