বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ (ঢাকা মেট্রো-৩, উত্তরা) কার্যালয় এখন অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। বিশেষ করে ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে পাহাড়সমান অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, তার সরাসরি ছত্রছায়ায় বিআরটিএ কার্যালয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। এই চক্রের মাধ্যম ছাড়া এখানে কোনো কাজ হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা মেট্রো-৩ সার্কেলে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেবা নিতে আসেন। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, সেখানে পা রাখলেই দালালের খপ্পরে পড়তে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন প্রতিটি ধাপে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের দিকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের সাথে দালালদের এক গভীর যোগসাজশ রয়েছে। বিআরটিএ চত্বরে দালালরা প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করে এবং গ্রাহকদের 'কন্টাক্ট' করার প্রস্তাব দেয়। যদি কোনো সাধারণ মানুষ সরাসরি নিয়ম মেনে আবেদন করতে যান, তবেই শুরু হয় বিপত্তি। ছোটখাটো নানা অজুহাতে তাদের ফাইল আটকে দেওয়া হয় অথবা মাসের পর মাস ঘুরানো হয়।
কিন্তু একই ব্যক্তি যখন দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের 'কন্টাক্ট মানি' জমা দেন, তখন সব জটিলতা যেন জাদুকরীভাবে মিটে যায়। ফাইলের ওপর বিশেষ কোড বা সংকেত দেখে সহজেই সেই কাজগুলো সম্পন্ন করে দেন হাফিজুল ও তার সহযোগীরা।
ভুক্তভোগী মোসাদ্দিক হোসাইন নামে এক তরুণ গ্রাহক তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, আমি ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফিল্ড টেস্ট ও ভাইভা দিতে গিয়েছিলাম। আমার সব ঠিক ছিল, কিন্তু ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলাম কোনো কারণ ছাড়াই নানা ভুল ধরে আমাকে অকৃতকার্য (ফেল) করে দেন। পরে একজনের পরামর্শে এক দালালের সাথে ৪ হাজার টাকায় চুক্তি করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরের বার আমি কিছুই করিনি, অথচ আমার রেজাল্ট 'পাস' চলে এল। টাকা দিলেই এখানে কাজ হয়, নিয়ম মানলে হয়রানি।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, মালিকানা বদলি বা ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে গেলেও একই অবস্থা। দালালের মাধ্যমে ফাইল জমা না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। আর দালালের মাধ্যমে গেলে কয়েক দিনেই কাজ হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ-র এই অরাজকতার পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে। যার কেন্দ্রে রয়েছেন হাফিজুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। অফিসের ভেতরে ও বাইরে তার বিশ্বস্ত কিছু লোক এই টাকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরে এসে এভাবে লুণ্ঠিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিআরটিএ-কে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সেবাগ্রহীতারা। ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামসহ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে হবে।
অনলাইনে সেবার মান আরও সহজ করতে হবে যাতে দালালের প্রয়োজনীয়তা না থাকে।
বিআরটিএ-র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন লুটতরাজ চলতে থাকলে সরকারের ডিজিটাল সেবা কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ গ্রাহকদের এখন একটাই প্রত্যাশা দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং উত্তরা বিআরটিএ-কে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হোক।
হাফিজুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই তিনি কাজ করছেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি মোট ১৫০টি রোল নম্বর বরাদ্দ রেখেছিলেন যার মধ্যে ৫০টি সাংবাদিকদের জন্য, ৫০টি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য এবং বাকি ৫০টি নিজেদের কাজের জন্য। তিনি আরও জানান যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই তিনি বড় কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় করে এসব কাজ করে আসছেন।

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ (ঢাকা মেট্রো-৩, উত্তরা) কার্যালয় এখন অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। বিশেষ করে ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে পাহাড়সমান অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, তার সরাসরি ছত্রছায়ায় বিআরটিএ কার্যালয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। এই চক্রের মাধ্যম ছাড়া এখানে কোনো কাজ হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা মেট্রো-৩ সার্কেলে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেবা নিতে আসেন। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, সেখানে পা রাখলেই দালালের খপ্পরে পড়তে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন প্রতিটি ধাপে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের দিকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামের সাথে দালালদের এক গভীর যোগসাজশ রয়েছে। বিআরটিএ চত্বরে দালালরা প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করে এবং গ্রাহকদের 'কন্টাক্ট' করার প্রস্তাব দেয়। যদি কোনো সাধারণ মানুষ সরাসরি নিয়ম মেনে আবেদন করতে যান, তবেই শুরু হয় বিপত্তি। ছোটখাটো নানা অজুহাতে তাদের ফাইল আটকে দেওয়া হয় অথবা মাসের পর মাস ঘুরানো হয়।
কিন্তু একই ব্যক্তি যখন দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের 'কন্টাক্ট মানি' জমা দেন, তখন সব জটিলতা যেন জাদুকরীভাবে মিটে যায়। ফাইলের ওপর বিশেষ কোড বা সংকেত দেখে সহজেই সেই কাজগুলো সম্পন্ন করে দেন হাফিজুল ও তার সহযোগীরা।
ভুক্তভোগী মোসাদ্দিক হোসাইন নামে এক তরুণ গ্রাহক তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, আমি ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফিল্ড টেস্ট ও ভাইভা দিতে গিয়েছিলাম। আমার সব ঠিক ছিল, কিন্তু ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলাম কোনো কারণ ছাড়াই নানা ভুল ধরে আমাকে অকৃতকার্য (ফেল) করে দেন। পরে একজনের পরামর্শে এক দালালের সাথে ৪ হাজার টাকায় চুক্তি করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরের বার আমি কিছুই করিনি, অথচ আমার রেজাল্ট 'পাস' চলে এল। টাকা দিলেই এখানে কাজ হয়, নিয়ম মানলে হয়রানি।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, মালিকানা বদলি বা ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে গেলেও একই অবস্থা। দালালের মাধ্যমে ফাইল জমা না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। আর দালালের মাধ্যমে গেলে কয়েক দিনেই কাজ হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএ-র এই অরাজকতার পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে। যার কেন্দ্রে রয়েছেন হাফিজুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে অতীতেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। অফিসের ভেতরে ও বাইরে তার বিশ্বস্ত কিছু লোক এই টাকার লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরে এসে এভাবে লুণ্ঠিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিআরটিএ-কে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সেবাগ্রহীতারা। ইন্সপেক্টর হাফিজুল ইসলামসহ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে হবে।
অনলাইনে সেবার মান আরও সহজ করতে হবে যাতে দালালের প্রয়োজনীয়তা না থাকে।
বিআরটিএ-র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন লুটতরাজ চলতে থাকলে সরকারের ডিজিটাল সেবা কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ গ্রাহকদের এখন একটাই প্রত্যাশা দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং উত্তরা বিআরটিএ-কে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হোক।
হাফিজুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়ম মেনেই তিনি কাজ করছেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি মোট ১৫০টি রোল নম্বর বরাদ্দ রেখেছিলেন যার মধ্যে ৫০টি সাংবাদিকদের জন্য, ৫০টি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য এবং বাকি ৫০টি নিজেদের কাজের জন্য। তিনি আরও জানান যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই তিনি বড় কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় করে এসব কাজ করে আসছেন।

আপনার মতামত লিখুন