ঢাকা    শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
দৈনিক দৃষ্টি

দাকোপে

শ্রমের ঘামে ভেজা মুখ: তরমুজের ভারে নারীত্বের জয়গান



শ্রমের ঘামে ভেজা মুখ: তরমুজের ভারে নারীত্বের জয়গান

ভোরবেলা যখন চারপাশ কেবল জাগতে শুরু করে, তখনই একদল নারী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, যার ভেতরে সযত্নে রাখা দুপুরের যৎসামান্য খাবার। সূর্য ওঠার আগেই তারা পৌঁছে যান দিগন্তজোড়া তরমুজ ক্ষেতে। কারো মাথায় বস্তাভর্তি তরমুজ, কারো হাতে কাস্তে উদ্দেশ্য একটাই, ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের অন্ন জোগানো।

খুলনার দাকোপ উপজেলার তরমুজ ক্ষেতগুলোতে এখন বইছে ব্যস্ততার হাওয়া। এই ব্যস্ততার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন এলাকার একদল সংগ্রামী নারী শ্রমিক। বিক্রি হওয়া ক্ষেতের তরমুজ কাটা থেকে শুরু করে তা বস্তাবন্দী করা এবং মাথায় করে বয়ে নিয়ে ট্রাকে বা ট্রলারে তুলে দেওয়া পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি সমানতালে সবটাই করছেন তারা।

প্রতিটি বস্তায় থাকে ৭ থেকে ৮টি বড় তরমুজ। তপ্ত ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে এই ভারী বোঝা তারা বয়ে নিয়ে যান গন্তব্যে। অথচ এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পারিশ্রমিক শুনলে অবাক হতে হয়। দূরত্ব ভেদে প্রতিটি তরমুজ বহনের জন্য তারা পান মাত্র ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা। এভাবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে দিনশেষে একেকজনের আয় হয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

উপজেলার মাদীয়ারচক এলাকা থেকে পশ্চিম বাজুয়া এলাকায় কাজ করতে আসা বিপুলা রায়, জয়শ্রী ঘরামী, শুভেচ্ছা কয়াল ও ইতিকা ঘরামীসহ বেশ কয়েকজন নারীর সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের জীবনসংগ্রামের পেছনের গল্প। প্রখর রোদ আর উপকূলীয় তীব্র গরম উপেক্ষা করে কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ—এমন প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক নারী শ্রমিক বলেন, "পেটের দায়ে আসি বাবা। ঘরে অভাব, পোলাপানের পড়ার খরচ, চাল-ডালের দাম সবই তো আকাশছোঁয়া। রোদ লাগলে শরীর পোড়ে ঠিকই, কিন্তু কাজ না করলে ঘরে চুলা জ্বলবে না।"

দাকোপের কৃষি অর্থনীতিতে এই নারীদের অবদান বিশাল হলেও তারা বরাবরই থেকে যান প্রচারের আড়ালে। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করলেও অনেক সময় মজুরি বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। তবুও জীবনযুদ্ধের তাগিদে তারা দমে যান না।

দিনশেষে যখন সূর্য ডোবে, তখন ক্লান্ত শরীরে এই নারীরা আবার ফিরে যান নীড়ে। হাতে থাকে কয়েকশ টাকার পারিশ্রমিক, আর মনে থাকে আগামীকালের নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি। দাকোপের তরমুজের মিষ্টি স্বাদ দেশের মানুষের তৃষ্ণা মেটালেও, এই নারীদের চোখের লোনা জলের নেপথ্য কাহিনি অজানাই থেকে যায়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক দৃষ্টি

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


শ্রমের ঘামে ভেজা মুখ: তরমুজের ভারে নারীত্বের জয়গান

প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভোরবেলা যখন চারপাশ কেবল জাগতে শুরু করে, তখনই একদল নারী ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, যার ভেতরে সযত্নে রাখা দুপুরের যৎসামান্য খাবার। সূর্য ওঠার আগেই তারা পৌঁছে যান দিগন্তজোড়া তরমুজ ক্ষেতে। কারো মাথায় বস্তাভর্তি তরমুজ, কারো হাতে কাস্তে উদ্দেশ্য একটাই, ঘাম ঝরিয়ে পরিবারের অন্ন জোগানো।

খুলনার দাকোপ উপজেলার তরমুজ ক্ষেতগুলোতে এখন বইছে ব্যস্ততার হাওয়া। এই ব্যস্ততার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন এলাকার একদল সংগ্রামী নারী শ্রমিক। বিক্রি হওয়া ক্ষেতের তরমুজ কাটা থেকে শুরু করে তা বস্তাবন্দী করা এবং মাথায় করে বয়ে নিয়ে ট্রাকে বা ট্রলারে তুলে দেওয়া পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি সমানতালে সবটাই করছেন তারা।

প্রতিটি বস্তায় থাকে ৭ থেকে ৮টি বড় তরমুজ। তপ্ত ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে এই ভারী বোঝা তারা বয়ে নিয়ে যান গন্তব্যে। অথচ এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পারিশ্রমিক শুনলে অবাক হতে হয়। দূরত্ব ভেদে প্রতিটি তরমুজ বহনের জন্য তারা পান মাত্র ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা। এভাবে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে দিনশেষে একেকজনের আয় হয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

উপজেলার মাদীয়ারচক এলাকা থেকে পশ্চিম বাজুয়া এলাকায় কাজ করতে আসা বিপুলা রায়, জয়শ্রী ঘরামী, শুভেচ্ছা কয়াল ও ইতিকা ঘরামীসহ বেশ কয়েকজন নারীর সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের জীবনসংগ্রামের পেছনের গল্প। প্রখর রোদ আর উপকূলীয় তীব্র গরম উপেক্ষা করে কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ—এমন প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক নারী শ্রমিক বলেন, "পেটের দায়ে আসি বাবা। ঘরে অভাব, পোলাপানের পড়ার খরচ, চাল-ডালের দাম সবই তো আকাশছোঁয়া। রোদ লাগলে শরীর পোড়ে ঠিকই, কিন্তু কাজ না করলে ঘরে চুলা জ্বলবে না।"

দাকোপের কৃষি অর্থনীতিতে এই নারীদের অবদান বিশাল হলেও তারা বরাবরই থেকে যান প্রচারের আড়ালে। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করলেও অনেক সময় মজুরি বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। তবুও জীবনযুদ্ধের তাগিদে তারা দমে যান না।

দিনশেষে যখন সূর্য ডোবে, তখন ক্লান্ত শরীরে এই নারীরা আবার ফিরে যান নীড়ে। হাতে থাকে কয়েকশ টাকার পারিশ্রমিক, আর মনে থাকে আগামীকালের নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতি। দাকোপের তরমুজের মিষ্টি স্বাদ দেশের মানুষের তৃষ্ণা মেটালেও, এই নারীদের চোখের লোনা জলের নেপথ্য কাহিনি অজানাই থেকে যায়।


দৈনিক দৃষ্টি

প্রকাশক ও সম্পাদক ম‌হিউদ্দিন শিবলী ও মোহাম্মদ মহসীন
প্রধান বার্তা সম্পাদক মোকাররম মামুন
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত